আন্তর্জাতিক রেসিং ট্র্যাকে ইতিহাস গড়লেন বাংলাদেশের পূর্ণি আয়মান

বাংলাদেশের নারীদের জন্য এক গর্বের অধ্যায় রচনা করলেন পূর্ণি আয়মান। তিনি প্রথম বাংলাদেশি নারী হিসেবে আন্তর্জাতিক রেসিং সার্কিটে প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়ে এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছেন। এই অসাধারণ অর্জন শুধু ব্যক্তিগত সফলতা নয়, বরং দেশের নারী সমাজের জন্য একটি অনুপ্রেরণার বার্তা।
 
শনিবার (৫ এপ্রিল) আবুধাবির বিখ্যাত ইয়াস মারিনা সার্কিটে অনুষ্ঠিত হয় “ইউএই টাইম অ্যাটাক” প্রতিযোগিতার দ্বিতীয় রাউন্ড। এই প্রতিযোগিতায় মোট ৩৫ জন রেসার বিভিন্ন ক্যাটাগরিতে অংশগ্রহণ করেন। পূর্ণি অংশ নেন “রিয়ার হুইল ড্রাইভ আনলিমিটেড ক্লাস” বিভাগে, যেখানে তিনি ২ মিনিট ৪৮.২৬৩ সেকেন্ড টাইমিং দিয়ে চতুর্থ স্থান অর্জন করেন। প্রতিযোগিতায় মোট ১৮টি ল্যাপ সম্পন্ন করতে হয়, যেখানে তার গড় গতি ছিল ঘণ্টায় ১১২.৯৯ কিলোমিটার।
 

পূর্ণির প্রতিযোগিতাটি আরও চ্যালেঞ্জিং ছিল এই কারণে যে, তার প্রতিদ্বন্দ্বীরা ছিলেন পরিশীলিত গাড়ির চালক। প্রথম ও দ্বিতীয় স্থানের রেসাররা চালাচ্ছিলেন পোরশে, আর তৃতীয় স্থান অধিকারী চালাচ্ছিলেন একটি বিএমডব্লিউ। পূর্ণি চালাচ্ছিলেন টয়োটা জিটি-৮৬। এমন প্রতিকূলতার মাঝেও তিনি যেভাবে নিজেকে প্রমাণ করেছেন, তা সত্যিই প্রশংসনীয়। তিনি বলেন, “পোরশে-এর বিপক্ষে প্রতিযোগিতা করাটা ছিল কিছুটা দুর্ভাগ্যের ব্যাপার, তবে আমি আমার প্রথম অভিজ্ঞতায় খুবই সন্তুষ্ট।”
 

পূর্ণি জানান, এই রেসে অংশ নেওয়ার প্রস্তাব আসে বাংলাদেশের জাতীয় মোটরস্পোর্টস কর্তৃপক্ষ AAB-এর পক্ষ থেকে। ২০২৪ সালে কাশফিয়া আরফা প্রথম বাংলাদেশি নারী হিসেবে এফআইএ ( FIA) প্রতিযোগিতায় অংশ নেন, তবে তা ছিল অটো জিমখানা নামক গ্রাসরুট মোটরস্পোর্টস। তার পরই AAB আরও নারী চালক খুঁজছিল, তখন অভিক আনোয়ার পূর্ণির নাম সুপারিশ করেন। পূর্ণি বলেন, “আমি তো এমনিতেই গাড়ি চালাই, তাই ভেবেছিলাম দেখে নিই, কেমন হয়!”
 

পূর্ণির প্রস্তুতির গল্পও কম অনুপ্রেরণামূলক নয়। দেশে কোনো রেস ট্র্যাক না থাকায় তিনি অনলাইনে সিমুলেটরে প্রশিক্ষণ শুরু করেন গত ডিসেম্বর থেকে। সেই সঙ্গে সিলেটের দুটি ইভেন্টে অংশ নেন। এরপর ১ এপ্রিল তিনি সংযুক্ত আরব আমিরাতে যান এবং দুবাই অটোড্রোমে সরাসরি ট্র্যাকে অনুশীলন করেন। তিনি জানান, “প্রথম কয়েকটি ল্যাপে ভয় পাচ্ছিলাম, কারণ ইয়াস মারিনা সার্কিটে এফ-১ রেসও হয়, এটি অনেক দ্রুত গতির ট্র্যাক। কিন্তু দুই-তিনটি ল্যাপ পর আমি আত্মবিশ্বাস ফিরে পাই।”
 
অবশেষে প্রতিযোগিতার শেষ দিকে একটি দুর্ঘটনার কারণে ২০ ল্যাপের মধ্যে ১৮টি সম্পন্ন হয়, তবে পূর্ণি সফলভাবে প্রতিযোগিতা শেষ করেন এবং চতুর্থ অবস্থানে থাকেন। দেশে ফিরে তিনি বলেন, “আলহামদুলিল্লাহ, আমি ভালো করেছি। এটা আমার স্বপ্ন পূরণের মতো। আমি গর্বিত যে বাংলাদেশের প্রথম নারী হিসেবে একটি আন্তর্জাতিক রেসিং সার্কিটে অংশ নিয়েছি।”
 

পূর্ণি বলেন, “আমি ছোটবেলা থেকেই গাড়ির প্রতি আকৃষ্ট। স্কুলে পড়ার সময় থেকেই ড্রাইভ করতাম। সময়ের সাথে সাথে এই ভালোবাসা আরও গভীর হয়েছে। এটি শুধু শখ নয়, বরং এটি একটি আজীবনের আবেগ, যা আমাকে প্রতিদিন নতুন কিছু শেখার ও চেষ্টা করার অনুপ্রেরণা দেয়।” তিনি আরও বলেন, “এটি শুধু আমার ব্যক্তিগত অর্জন নয়, বরং দেশের নারীদের জন্য একটি দৃষ্টান্ত। আমি বিশ্বাস করি, নারীরাও এই পুরুষপ্রধান জগতে সফল হতে পারে। আমি প্রস্তুত নতুন চ্যালেঞ্জের জন্য এবং আগামীর পথচলায় আশাবাদী।”
সূত্র ইনকিলাব

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *